আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা

আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা

বাংলা তথ্য

আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যা একবার কারো দেখা দিলে তাকে সুস্থ বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব । তাই আয়োডিনের অভাবে যে সমস্ত সমস্যা হয় তার চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই একমাত্র কাম্য। খাদ্যে আয়োডিনের অভাব ঘটলে “ঘ্যাগ” বা গলগন্ড রোগ হয়, অর্থাৎ গলা ফুলে যায়। ঘ্যাগ ছাড়াও আয়োডিনের অভাবে অন্যান্য মারাত্মক সমস্যা হয়। যেমনঃ

• মায়ের বিকলাঙ্গ সন্তান প্রসব

• স্নায়বিক দূর্বলতা

• বধিরতা

• বাকশক্তিহীনতা

• বিভিন্ন দৈহিক ক্রটি

• মানসিক প্রতিবন্ধকতা, হাবাগোবা হওয়া

• বামন বা বেঁটে হওয়া

• শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে বাধাপ্রাপ্ত

ঘ্যাগ কেন হয়ঃ

দেহের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের প্রতিদিন প্রায় ১৫০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন দরকার । যখন আমাদের রক্তে কোন কারণে আয়োডিনের অভাব ঘটে তখন গলায় অবস্থিত ‘থাইরয়েড গ্রন্থি’ আয়ােডিন সগ্রহের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। এর। ফলে গ্রন্থিটা ক্রমশ আকারে বড় হতে থাকে এবং ঘ্যাগে পরিণত হয়। প্রথম অবস্থায় এটি বেশ ছোট থাকে এবং চোখে পড়ে না। কিন্তু আয়ােডিনের অভাব চলতে থাকলে ঘ্যাগ আরও বড় হয়ে গলায় ঝুলে পড়ে।

ঘ্যাগের সামাজিক অসুবিধাঃ

ঘ্যাগ আক্রান্ত লোকজনকে সমাজে হেয় চোখে দেখা হয়। তাদের সাথে কাজকর্ম, ফরা ও কথাবার্তা বলতেও লোকজন ইতস্তত করে । কিশোরী বয়সে আয়োডিনের অভাবে অনেক মেয়ের গলা কিছুটা ফুলে ওঠে।

বাংলাদেশের আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যাঃ

আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরের গলগন্ড ও আয়োডিনের অভাবজনিত প্রতিবন্ধী লোকের সংখ্যা তিন কোটিরও বেশী । প্রায় সব অঞ্চলেই গলগন্ড হয়, তবে উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহে সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। প্রতিবছর বন্যায় এসব এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়, ফলে মাটিতে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা দেয়। জামালপুর ও রংপুরে যথাক্রমে ২৯.১৬% এবং ২৭.৪৫% লোক গলগন্ডে আক্রান্ত ।

আয়োডিনের উৎসঃ

প্রকৃতিতে আয়োডিনের প্রধান উৎস সমুদ্রের পানি। সূর্যকিরণে আয়োডিন বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে, মাটিকে আয়োডিনসমৃদ্ধ করে। মাটিতে ও পানিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ আয়োডিন থাকলেই উদ্ভিদজাত ও প্রাণীজাত খাবারে প্রয়ােজনীয় আয়োডিন পাওয়া যায়। মাটিতে আয়োডিনের ঘাটতির প্রধান কারণ হচ্ছে প্রবল বৃষ্টি ও ঘন ঘন বন্যা। এর ফলে মাটির আয়োডিন হ্রাস পায় । ঘন ঘন বন্যাপ্লাবিত এলাকা বা চর এলাকায় যেসব শস্য বা খাদ্যসামগ্রী জন্মায় সেসব শস্য ও খাদ্যে আয়োডিনের পরিমাণ খুবই কম থাকে। অনেক সময় আবার একেবারেই থাকে না। ফলে এ অঞ্চলের লােকজন ক্রমাগত আয়োডিনবিহীন খাবার খেয়ে আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

প্রতিকারঃ

আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার দু’টি উপায় আছে, একটি হল লিপিওডল ইনজেকশন দেওয়া, দ্বিতীয়টি হল খাবারের মাধ্যমে বিশেষ করে লবণের মাধ্যমে আয়োডিন গ্রহণ । গলগন্ড যদি প্রথম অবস্থায় ধরা পড়ে তাহলে ইনজেকশন অথবা খাবারের মাধ্যমে সারানো সম্ভব। কিন্তু যদি খুব বড় হয়, তাহলে অস্ত্রোপচার ছাড়া সারানো সম্ভব নয়।

প্রতিরোধঃ

আয়োডিনযুক্ত লবণ খেলে আয়োডিনের অভাব হয় না। লবণে আয়োডিন মেশালে লবণের স্বাদ বা গন্ধের কোন পরিবর্তন হয় না। আয়োডিনযুক্ত লবণ সরাসরি খাবারের সাথে বা রান্না করার তরকারীতে খাওয়া যায় ।।

আয়োডিনযুক্ত লবণের গুণ রক্ষা করাঃ

আয়োডিনযুক্ত লবণ আর্দ্রতারোধক ব্যাগে সীল করে রাখা উচিত।

আয়োডিনের ঘাটতির ফলে ক্লান্তি, ঝিমুনি আসা, উচ্চ কোলেস্টেরল, বিষণ্ণতা, থাইরয়েড গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা যায়। এছাড়াও আয়োডিনের ঘাটতির ফলে প্রেগনেন্সির সময়ে এবং শিশুর জন্মের সময়ও জিটিলতা দেখা দিতে পারে। একজন মানুষের দৈনিক ১৫০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন গ্রহণ করা উচিত্‍

যে কোন প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন